৩ মে ২০১৩ - ১৯:৩০
আর কত লাশ আছে ধারণা করা যাচ্ছে না

রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন বের হচ্ছে খণ্ড-বিখণ্ড লাশ। কারওবা হাত, কারও পা আবার কারও মাথা। খণ্ড-খণ্ড সে লাশ জড়ো করে ঢোকানো হচ্ছে ‘বডিব্যাগে’।

বার্তা সংস্থা আবনা : রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন বের হচ্ছে খণ্ড-বিখণ্ড লাশ। কারওবা হাত, কারও পা আবার কারও মাথা। খণ্ড-খণ্ড সে লাশ জড়ো করে ঢোকানো হচ্ছে ‘বডিব্যাগে’। গত কয়েক দিনে কোন কোন লাশ এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে যে, ছেলে না মেয়ে শনাক্ত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। অভিযানের দশম দিনে বৃহস্পতিবার মধ্য রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ধসেপড়া ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আরও ৭৫টি লাশ। সব মিলিয়ে ২৪ এপ্রিল ভবন ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া লাশের সংখ্যা ৫১১। সাভারের ওই মৃত্যুকূপে আর কত লাশ আছে তা ধারণা করতে পারছেন না কেউ। ধ্বংসস্তূপ থেকে যতই সরানো হচ্ছে স্তূপ ততই বেরুচ্ছে লাশের ছিন্নভিন্ন অংশ। এ কারণে লাশের প্রকৃত হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত বিধ্বস্ত ওই ভবনের পেছনের অংশ থেকে লাশগুলো উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকর্মীদের ধারণা, ২৪ এপ্রিল ধসের সময় ওই ভবনে থাকা শ্রমিকরা সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নেমে আসার চেষ্টা করেন। আর তখন পুরো ভবন বিধ্বস্ত হলে হতভাগ্য শ্রমিকরা চাপা পড়েন। ভবনের পেছনের অংশ দেবে গিয়ে একেবারে স্যান্ডুইচের মতো হয়ে গেছে।

এদিকে শুক্রবার বিকালে বিধ্বস্ত ওই ভবন দেখতে আসেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ অ্যাডভোকেট। বিধ্বস্ত ভবনের সামনে একটি তাঁবুতে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী রাষ্ট্রপতিকে উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে ব্রিফ করেন। রাষ্ট্রপতি উদ্ধার কাজ ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরে তিনি সাভার এনাম মেডিকেলে চিকিত্সাধীন আহতদের দেখতে যান। এর আগে সকালে দুর্ঘটনাস্থলে আসেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। তিনি ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং উদ্ধার কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে তিনি এনাম মেডিকেলে গিয়ে আহতদের চিকিত্সার খোঁজখবর নেন। এ সময় তিনি ভবন ধসের ঘটনায় পঙ্গু হয়ে যাওয়া ৮ শ্রমিককে যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন ততদিন নিজ তহবিল থেকে প্রতিমাসে ৫ হাজার করে টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

বের হচ্ছে খণ্ড খণ্ড লাশ : স্মরণকালের ওই ভবন ধসের দশম দিনেও অভিশপ্ত রানা পাজার ভেতর থেকে বের হচ্ছে খণ্ড খণ্ড লাশ। পচা ও গলিত লাশগুলো চেনার উপায় নেই। কোন কোন লাশ এমনভাবে বিকৃত হয়ে গেছে যে, ছেলে না মেয়ে বোঝার উপায় নেই। তার পরও একেকটি লাশ উদ্ধারের পর স্বজনরা প্রিয়জনের লাশের খোঁজে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। এসকেভেটরের আঁচড়ে যতই ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে ততই বের হয়ে আসছে খণ্ডিত মৃতদেহ। কোন কোন লাশের পরনে থাকা পোশাকের অংশ, টিফিন ক্যারিয়ার, রড, কাপড়ের রোলসহ গার্মেন্টের যন্ত্রাংশ বেরোচ্ছে। আর এর মাঝেই পাওয়া যাচ্ছে কারও মাথা কারোবা হাত-পা। শুক্রবার সকালে উদ্ধার হওয়া এমন একটি লাশের পরিচয় মেলে তার পকেটে থাকা একটি মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে। গত কয়েক দিনে মোবাইল ফোনের চার্জ চলে যাওয়ায় এক উদ্ধারকর্মী ওই মোবাইল ফোনের সিম খুলে অপর একটি মোবাইল থেকে কললিস্ট নিয়ে ফোন করেন। ফোনের অপর প্রান্তে পঞ্চগড়ের এক বৃদ্ধ জানান, মোবাইলটি তার ছেলে সেলিমের। পরে তাকে লাশ নিয়ে যেতে বলা হয়। শুক্রবার এভাবেই শনাক্ত করা হয়েছে কিছু লাশ। বাকি লাশ শনাক্ত করতে না পারায় বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ৩টি লাশ ছিল সাভারের অধরচন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে। জেলা প্রশাসন বলেছে, লাশগুলো শনাক্ত করা না গেলে আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়ে দেয়া হবে।

ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে এলো অস্ত্র-গুলি : সাভারে রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে লাশের পাশাপাশি শুক্রবার বেরিয়ে এসেছে একটি বিদেশী পিস্তল ও ৫ রাউন্ড গুলি। উদ্ধারকর্মীরা জানান, বৃহস্পতিবার রাত ১টার দিকে উদ্ধার অভিযান চলাকালে ধ্বংসস্তূপের সামনের অংশে পিস্তলটি পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত র‌্যাব সদস্যদের হাতে সেটি হস্তান্তর করেন তারা। শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে র‌্যাব-৪ এর ক্যাম্প কমান্ডার মেজর কে এম আরিফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, রানা পাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে পিস্তলের সঙ্গে পাঁচটি গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকর্মীদের ধারণা, পিস্তলটি ভবন মালিক সোহেল রানা বা তার কোনো সঙ্গীর হয়ে থাকতে পারে। ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদুর রহমান বলেন, ‘আগ্নেয়াস্ত্রটি র‌্যাবের হেফাজতে আছে। তাদের কাছ থেকে সেটি থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।

তারা বাঁচতে চেয়েছিলঃ : শুক্রবার সকাল থেকেই ধসেপড়া ভবনটির সামনে ও পেছনের অংশে একযোগে শুরু হয় ধ্বংসস্তূপ অপসারণের কাজ। পেছনে ভারি হাইড্রোলিক ক্রেনের সাহায্যে কংক্রিটের ¯াবগুলো তুলে আনার পর ঝুলে থাকতে দেখা গেছে হতভাগ্য কয়েক শ্রমিকের হাত-পা। উদ্ধারকারীরা সেখানে পৌঁছলেও ভারি বিমের চাপার কারণে শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা যায়নি। বেলা পৌনে ১টার দিকে আরও এক নারীর লাশ তুলে আনার জন্য ছুটে যান সেনাবাহিনী ও ফায়ার ব্রিগেডে